নভেম্বরের শুরু। ঘুরতে এসেছি— তিন দিন দুই রাতের ট্রিপ। সকালবেলাতেই বোটে চড়েছি, সেই থেকেই জল আর জল। দু’পাশে ম্যানগ্রোভ— কখনও ঘন জঙ্গল, আবার কখনও হালকা। একটু ফাঁক পেলেই দৃষ্টি অনেক দূর অবধি অনায়াসে চলে যায়।আমরা মোট আটজন, একেবারেই পারিবারিক ট্যুর— আমরা দুই ভাই, সঙ্গে সহধর্মিণী, মেয়ের বর আর ওদের শ্বশুর-শ্বাশুড়ি। মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাটভাঙা নতুন বৌয়ের মতো— দেখা পেতেই অনেক কসরত, সোহাগ করবে দূরের কথা ! ফলে হাতে অঢেল সময়। অলস আড্ডা চলছে, আর মন পড়ে আছে শ্যেনদৃষ্টিতে গাছের ডালে ডালে।
সময়টা পঞ্জিকা মেনে ঠিক করা হয়েছিল, অর্থাৎ মরা কোটাল জেনে, সেদিক থেকে সম ভাল তবে এক মাস পরে এলে ভালো ছিল; তখনই আসলে পাখি দেখার আসল সিজন। এই তো দেখা গেল ব্ল্যাক-হেডেড কিংফিশার, তো আবার উড়ে যাচ্ছে শঙ্খচিল। আমাদের সময়টা একটু আগেই হয়ে গেছে । তবু মন খারাপের উপায় নেই। দুঃখটা ভুলিয়ে দিচ্ছেন আমাদের গাইড কাম ট্যুর অপারেটর অরুণ সরকার। দফায় দফায় চা–কফি চলছে। সঙ্গে কখনও শুধু বিস্কুট, কখনও আবার ফিশ ফ্রাই— কিছু না কিছু থাকছেই। আমাদের বুড়ো মাথাই বেশি, তবু উৎসাহে ভাঁটা নেই। সবার মনেই কমবেশি সুন্দরবন নিয়ে কৌতূহল। আলোচনার মূল রস সুন্দরবনের যাপনকথা আর লোকবিশ্বাসের ইতিকথা।
আমার যেহেতু দ্বিতীয়বার, তাই এই ইতিহাস অনেকটাই জানি। আমি অল্প তফাতে, ক্যামেরায় চোখ লাগিয়ে বসে আছি। একদম নিরাশ হচ্ছিলাম তা নয়— মাঝেমাঝেই সুন্দরবন চমক দিচ্ছে চোখে। ফাঁকে ফাঁকেই নজরে পড়ছে হোয়াইট-কলার কিংফিশার, ধলচাঁদ ঈগল, কখনও কাঠঠোকরা বা মদন টাক বক— ইংরেজিতে যাকে বলে Lesser Adjutant Stork। আমার ক্যামেরায় তখন শুধু খটাখট— ভীষণ ব্যস্ত আমি।
দুপুরের খাবারে আবারও এলাহি আয়োজন— বিয়েবাড়িকেও হার মানায় এমন অবস্থা ! মাছই শুধু পাঁচ রকম— পারসে ভাজা, কাচকি ভর্তা, ট্যাংরা, বোয়াল, সবশেষে বাগদা চিংড়ি। সঙ্গে পেঁপের চাটনি, নলেনগুড়ের সন্দেশ, ডাল–সবজি তো আছেই। একটার পর একটা আরও স্বাদ, কিন্তু এত খাবার খাওয়া যায় ! সবাই ভীষণ আপ্লুত, প্রশংসায় পঞ্চমুখ এমন ভাল ট্যুর অপারেটর হয় না । আমার অভিজ্ঞতা আছে, তাই জানতাম । সত্যি করে বললে, পাখির পাশাপাশি এই মাছখাওয়ার লোভটাও যে আমার ছিল না, তা নয়— আফটার অল, বাঙালি তো ! খাওয়া শেষে আবার অলস বেলা যাপন।
সুন্দরবনের নিয়ম হচ্ছে, বিকেল পাঁচটার মধ্যে জঙ্গল থেকে বেরোতে হবে। আমাদের বোট যখন বালিদ্বীপের ঘাট ছুঁয়েছে, সূর্য তখন ডুবু ডুবু। জঙ্গল পেরিয়ে এসেছি ঠিক সময়ে তবে তারপরও অনেকটা পথ ।এই দ্বীপের জল খুব ভালো— যত বোট খাঁড়িতে ঘোরে, সবাই এখান থেকেই তুলে নেয় খাবার জল। অরুণবাবু তাই এখানেই থাকার ব্যবস্থা করেছেন ।
ঘাট থেকে রিসোর্ট খানিকটা হাঁটা পথ। খাবারের প্রাচুর্যে বিনা পরিশ্রমেও শরীর ক্লান্ত। দ্বীপের ইট-বসানো কাঁচা পথ, জোয়ার-ভাটার অত্যাচারে সূতিকা রোগীর হাল। তার ওপর দিয়ে অতি সাবধানে এগোচ্ছি । হঠাৎ—“বাবু, ডাব খাবেন? একশ টাকায় তিনটে।”
একটা লোক টানা ঠেলাগাড়িতে গোটা পনেরো ডাব নিয়ে দাঁড়িয়ে। পাশে সম্ভবত ওর স্ত্রী।
এই সন্ধ্যায় কে ডাব খায়? তবু স্বভাবদোষেই জিজ্ঞেস করলাম, “কত বললে?”
— “আজ্ঞে, একশ টাকায় তিনটে।”
— “এত দাম! চারটে হবে?” বলেই মনে পড়ল, আমার শহরে এক একটা ডাব ষাট টাকা। পায়ে ধরলেও দোকানদার এক টাকা কমাবে না। কিন্তু ওই যে স্বভাব— কিছুতেই সন্তুষ্টি নেই ! বললাম, “কি বলো, দেবে?”
জবাবে পাশের মেয়েটি ইতস্তত করে বলল, “না কাকু, দেওয়া যায় না।”
আমার কেন যেন মনে হল, একটু চাপ দিলে দিয়ে দিতেও পারে। বললাম, “তোমাদের ইচ্ছা, চারটে হলে নিতাম।”
লোকটা নিরুত্তর। আমি ডাব কেনার বিশেষ আগ্রহে নেই, চলেই যাচ্ছিলাম, তখন কানে এল মেয়েটি বলছে—“তোমাকে কত করে বললাম, চল বাজারে যাই, শুনলে না তো! এখন?”
— “আমি কি জানতাম, ওরা একটাও নেবে না?”
— “নেবে না-ই তো ! এই ভর সন্ধ্যায় কে ডাব খায়? আজকের নিত্যবাজারের কি হবে?”মেয়েটির গলায় এক অদ্ভুত অসহায় সুর !
থেমে গেলাম। ফিরে গিয়ে বললাম, “দাও দেখি, খেয়ে দেখি কেমন মিষ্টি তোমার ডাব।”
— “খুব মিষ্টি কাকু, খেয়েই দেখো!” মেয়েটির চটপট উত্তর ।
নিজেই একটা বেছে নিয়ে বলল, “এইটা দাও কাকুকে, খেয়ে বলুক কেমন মিষ্টি।”
বললাম, “এই সন্ধ্যায় তোমার ডাব খেতে কে আসবে?”
মেয়েটি বেশ চটপটে । বলল— “আমিও তো সেই কথাই বলেছিলাম, শুনলে হয় ! বলল, আজ নতুন গেস্ট এসেছে, বিক্রি হয়ে যাবে ! সেই তো বিকেল তিনটে থেকে গেটে বসে আছি, হলো ?”
— “সেকি! কেন?”
— “নইলে জায়গা দখল হয়ে যেত বাবু।”
আমি অবাক।
— “কাকু, কেমন মিষ্টি?”
জিজ্ঞেস করলাম, “তোমাদের বাড়ির গাছের বুঝি?”
— “হ্যাঁ কাকু, আমাদের নিজের ফসল। আর একটা দিই?”
— “দাও আরও সাতটা, বাকিদেরও খাইয়ে দিই । তবে রিসোর্টে পৌঁছে দিও কিন্তু!”
আটটা ডাব ! হঠাৎই খুশির হাওয়া বয়ে গেল চারপাশে।ডাব কাটতে কাটতে লোকটা বলল, “বাড়ির ফসল, তাতে কি যায় আসে বাবু— কুড়িটা ডাব পাড়তে রশিদকেই দিতে হয়েছে ষাট টাকা, সঙ্গে দুটো ডাব। সারাদিনে বিক্রি মাত্র তিনটে! রশিদ এসে গুনে নিয়ে গেল ষাট টাকা, আর এই আপনার কাছের বিক্রি...”
মনে মনে ভাবলাম, আজ দুপুরে যা মাছ খাওয়া হয়েছে, তাতে এমন দুই ঠেলা ডাব অনায়াসে কেনা যায়।
— “বাজারে নিয়ে গেলে না কেন?”
— “ওখানে কানু মোল্লা কুড়ি টাকার একটা টাকাও বেশি দিত না, সব কটা বিক্রি হলেও হাতে ক’টাকা পেতাম বলুন?”
পকেট থেকে তিনশো টাকা বের করে বললাম, “কত হলো?”
— “ছ’টা ডাবের দাম দুইশো, আর দুটো জন্য ষাট দিলেই চলবে— মোট দুশো ষাট।”
বললাম, “পুরোটাই রেখে দাও।”
— “কিন্তু…”
— “মনে করো, এই টাকাটা আমি তোমাকে দিচ্ছি।”
লোকটা কিছু বলতে চেয়েও পারল না। টাকাটা হাতে গুঁজে দিয়ে আমি সোজা রিসোর্টের পথে হাঁটতে লাগলাম। মনের মধ্যে এক অদ্ভুত আত্মশ্লাঘা।হঠাৎই পিছন থেকে—“বাবু!”
ফিরে দেখি লোকটা আরেকটা কাটা ডাব হাতে দাঁড়িয়ে।
— “এটা আবার কেন? আটটা ডাব তো দিয়েছ।”
— “এইটা আমাদের তরফ থেকে বাবু।”
এক মুহূর্ত লাগল হিসাব বুঝে নিতে। আমার শ্লাঘায় টেনে কশাঘাত।
বললাম— “না, দরকার নেই।” আসলে আমি সস্তায় মহান হতে মরিয়া ।
— “কেটে এনেছি বাবু, ক্ষতি হবে না।”
হাত বাড়িয়ে ডাবটা তুলে নিতেই লোকটা নিঃশব্দে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল । আনমনে চুমুক দিচ্ছি, মনে হচ্ছিল—এ শুধু মিষ্টি জল নয়, এতে লুকিয়ে আছে একজন পরিশ্রমী মানুষের আত্মসম্মানের নিখাদ রস। আমি শ্রদ্ধায় তার শেষ ফোটাটুকু শুষে নিলাম নিঃশব্দে !
Comments
Post a Comment