দলিল

তোমার শেষ দলিলটা গতকাল‌ই পেয়েছি
দলিল বলছি বটে আসলে উইল, 
তোমার শেষ ইচ্ছে ...।

তোমার বাড়ি গিয়েছিলাম কাল
তালার সাথে আড়ি দিয়ে
খোলা ছিল কপাট --
অনেকটা তোমার মনের মতো, 
সকালের রোদ্দুর থেকে অমবস্যার অন্ধকার
তোমার ঘরে নিত্য খোলা দ্বার।
আমি দেখলাম, গতকালও তেমনি আছে,
এখনও অস্পৃশ্যতার উর্ধ্বে ।

তোমার শয্যা উত্তর শিয়রে ছিল
যেখানে শুলে ধরা দেয় পশ্চিমের আকাশ ।
রাতের শেষ তারাটি ঠিক ওই জায়গাতে এসে,
একটুখানি থমকে দাঁড়ায় রোজ
যাবার আগে বিদায় জানিয়ে যেতে।
তুমি কিন্তু যাবার আগে বলে যাও নি,
কালরাত অভিমানে আমাকেই বললে সে।
বালিশের নীচে যে স্বপ্নগুলো
তিলে তিলে জমিয়ে গেলে উত্তরসূরীর জন্যে
ওদের কাছে সবটাই আবর্জনাসম।
আমি তাই বিলিয়ে দিয়েছি --
                তোমার‌ই কথামতো।
কত কত মেয়েরা এলো
আমি তাদের নাম‌ও জানিনা,
অঞ্জলী ভরে স্বপ্ন তুলে নিলে নিজেই,
বুকে জড়িয়ে ধরে সেকি কান্না,
তোমার চোখেও জল এসে যাবে, জানো !
ওরা সত্যি স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছে সবাই।
একুশ শতকেও দাসত্ব জীবন,
সেবা আর ভোগের মাধ্যম মাত্র।
তোমার স্বপ্নগুলো ওদের জীবন পাল্টে দেবে।

টেবিলে রাখা রঙের কৌটা গুলো
নিয়ে গেছে চাংসেনের স্ত্রী ।
চাংসেনকে মনে আছে তোমার ?
কাশ্মীর সীমান্তে প্রাণ দিয়েছিল যে সৈনিকটি -
তার বৌ এসে নিয়ে গেল সবকটা রঙ।
ওদের একটা সংস্থা আছে ছবি আঁকার
কী করে বাঁচতে হয় শিখিয়ে দেয় ওরা।

দেরাজে কোন টাকা কড়ি ছিল না
তারচেয়েও দামী ছিল কিছু,
যুগযুগ ধরে যে জ্ঞান তুমি সঞ্চয় করেছিলে --
বিলিয়ে দিয়েছি দলিতদের মধ্যে।
মানুষ হয়ে বাঁচার মন্ত্র যে ব‌ইটিতে লেখা
সেটি নিয়েছে ওই ছেলেটি --
যে একটাও প্রাইভেট টিউটর না রেখে
মাধ্যমিকে প্রথম হয়েছিল গেল বছর।

কিছু শান্তি ছিল তোমার রান্নাঘরে
হরেকরকম কৌটাতে সাজানো
তোমার কথামতো সবটাই দিয়েছি ভাগ করে
বৃদ্ধাশ্রমে সব মায়েদের মধ্যে।
তুমি তো জানো কতটুকুই ছিল তোমার সঞ্চয়
এইকটাতে ক'দিন‌ই বা চলে ?
তবু ওদের জন্যে অনেকখানি পাওয়া
বলেছি, আপনাদের ছেলে পাঠিয়েছে মা ।

বালতি ভর্তি চোখের জল জমিয়েছিলে কেন ?
তুমি পারোও বটে দাদা !
জানো না জমা জলেই সব রোগের সৃষ্টি ?
ভাবছো কবিদের কাজে লাগতে পারে ?
দাদা, সেদিন কবেই ফুরিয়ে গেছে।
চিংড়ির মালাইকারি দাঁতে কাটতে কাটতে
দেশভাগের কবিতা লেখা যায় ? তুমিই বলো ?

তোমার আক্রোশগুলো পুঁটলি বাধা আছে
যুবকদের দিতে বলেছিলে
ওরা এখন ব‌ইএর চাপে নিজেরাই বিভ্রান্ত
জ্বলে ওঠার সেই বারুদ নয়।
বরং যদি চাও, ছড়িয়ে দিই কলে কারখানায়
আর বুড়ো কৃষকের কাস্তেতে
ওরা এখন সত্যিই কোণঠাসা।

খাটের নীচে, ঘরের কোনায়
কিছুটা ঈর্ষা, লালসা, আর স্বার্থপরতা ছিল
তোমার অস্থির সাথে ভাসিয়ে দিয়েছি গঙ্গায়
গঙ্গাজলে সব শুদ্ধ হয়ে যায়।
শুধু পাগলামিটা র‌ইল আমার কাছে,
ক্ষমা করে দিও, দিতে পারিনি।
যদি কোন বাউল আসে পথে
কিংবা হ্যামলিনের বাঁশি হাতে কেউ -
যার বাঁশি শুনে গৃহস্থের কপাট যাবে খুলে
দলেদলে বেড়িয়ে পড়বে রাস্তায়
ওদের কোন ধর্ম থাকবে না
কোন জাত পাত, নারী পুরুষে ভেদ
পশুর খোলসগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে
নতুন একদল মানুষ এগিয়ে যাবে 
                      দেবত্বের দিকে
আমি তখন তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দেব     
                    তোমার সবটুকু পাগলামি
এখন না হয় আমার কাছেই থাক।

Comments